কুরআনভিত্তিক ৫টি রহস্যময় ধাঁধার জবাব: পণ্ডিত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)–এর জ্ঞানের গভীরতা
ইতিহাসের আকাশে কিছু নাম নক্ষত্রের মতো জ্বলে—যারা শুধু মানুষ নন, একেকটি যুগের চেতনা। তেমনই এক দীপ্ত নাম আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)—মহানবী ﷺ–এর চাচাতো ভাই, দোয়ার ফলপ্রসূ সন্তান।
রাসূল ﷺ তাঁর জন্য প্রার্থনা করেছিলেন—
“হে আল্লাহ! তাকে দ্বীনের গভীর বোধ দান করুন এবং কুরআনের তাফসির শিক্ষা দিন।”
সে দোয়া ইতিহাসে রূপ নিয়েছিল আলোর নদীতে।
সাহাবিদের মাঝে তিনি পরিচিত হলেন—‘হিবর’ (মহাপণ্ডিত) ও ‘বাহর’ (জ্ঞানের সাগর) নামে।
যুবক বয়স, অথচ প্রজ্ঞায় প্রবীণ—এমন স্বীকৃতি দিয়েছিলেন উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)।
৫টি কুরআনভিত্তিক ধাঁধা এবং ইবনে আব্বাস (রা.)
একদিন তাঁর হাতে এল এক পত্র—দার্শনিক প্রশ্নে ভরা, রহস্যে মোড়া।
এ যেন জ্ঞানের এক ময়দান, যেখানে শব্দ ছিল অস্ত্র, আর প্রজ্ঞা ছিল ঢাল।
১/ ধাঁধা—
যার দেহে রক্ত-মাংস নেই, অথচ কথা বলে—সেই জিনিসটা কী?
তিনি বললেন—
সে হলো জাহান্নাম!
কেয়ামতের দিন জান্নাতীরা জান্নাতে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে প্রবেশ করার পর আল্লাহ তাআলা জাহান্নামকে জিজ্ঞেস করবেন—
“তুমি কি পূর্ণ হয়েছ?”
আর জাহান্নাম বলবে—
“আরও আছে কি?”
অর্থাৎ—আমার উদর তো ভরেছে, তবে আপনার অবাধ্যদের জন্য আরও জায়গা আছে।
[সূরা ক্বাফ: ৩০]
জাহান্নাম রক্ত-মাংসের কোনো প্রাণী নয়, তথাপি সে তার সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে কথা বলবে। আল্লাহর অবাধ্য বান্দাদের পরিণতি ও জাহান্নামের ভয়াবহতার বর্ণনায় এ প্রসঙ্গটি এসেছে পবিত্র কুরআন–এর সূরা ক্বাফে।
রক্ত-মাংস নয়, তবু কথা বলবে—
কারণ আল্লাহ যখন চান, সৃষ্টি তখন ভাষা পায়।
২/ ধাঁধা—
যে রক্ত-মাংসের প্রাণী নয়, শুধু একটি বস্তু; তবু দৌড়েছিল জীবন্তের মতো—সেটি কী?
উত্তর—হযরত মূসা (আ.)–এর লাঠি।
ফেরাউনের দরবারে তা সাপ হয়ে যাদুকরদের দিকে ধাবিত হয়েছিল।
এ বর্ণনা এসেছে পবিত্র কুরআন–এর সূরা ত্বহা ও সূরা শু‘আরায়।
এ ছিল অলৌকিকতার শিক্ষা—
স্রষ্টার হুকুমে জড় বস্তুও প্রাণ পায়।
৩/ ধাঁধা—
দুটি বস্তু, যাদের মধ্যে রক্ত-মাংস নেই, তবু প্রতিউত্তর দেয়—সেই বস্তু দুটি কী?
তিনি বললেন—
আকাশ ও পৃথিবী।
সৃষ্টি লগ্নে আল্লাহ বললেন—
“তোমরা উভয়েই এসো, স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায়।”
তারা বলল—
“আমরা স্বেচ্ছায় অনুগত হয়ে এলাম।”
[সূরা ফুসসিলাত: ১১]
এখানে শেখানো হলো—
আল্লাহর আদেশে বিশ্বজগৎও সাড়া দেয়; তবে মানুষ কেন দ্বিধা করে?
৪/ ধাঁধা—
যে শ্বাস নেয়, অথচ রক্ত-মাংসে গড়া প্রাণী নয়—কী সেই বস্তুটি?
উত্তর—ভোর।
“ভোরের শপথ, যখন সে শ্বাস নেয়।”
[সূরা তাকভীর: ১৮]
অর্থাৎ, রাতের অন্ধকার ঘুচে যখন ভোরের স্নিগ্ধ আলো ফুটতে থাকে এবং মৃদুমন্দ বাতাস বইতে থাকে—সে অবস্থাকে অলংকারপূর্ণ ভাষায় ‘ভোরের শ্বাস’ বলা হয়েছে।
সূরা তাকভীরের ভাষা যেন কবিতার চেয়েও গভীর।
অন্ধকার ভেদ করে আলো ওঠে—
এটাই ‘ভোরের শ্বাস’।
৫/ ধাঁধা—
সৃষ্টিকর্তা একজন বার্তাবাহক প্রেরণ করেছেন—মানুষ নয়, জিন নয়, ফেরেশতা নয়; তবু সে আল্লাহর প্রেরিত বার্তাবাহক। কে সে?
উত্তর—একটি কাক।
কাবিলকে শিখিয়েছিল কিভাবে ভাই হাবিলকে দাফন করতে হয়।
পবিত্র কুরআন–এ এসেছে—
“অতঃপর আল্লাহ একটি কাক প্রেরণ করলেন। সে মাটি খুঁড়ছিল, যাতে তাকে শিক্ষা দেয় যে, আপন ভাইয়ের মৃতদেহ কিভাবে আবৃত করবে।”
[সূরা মায়েদা: ৩১]
জ্ঞান কখনো অহংকার করে না—
সে কখনো কাকের ঠোঁটেও ধরা দেয়।
মূল শিক্ষণীয় বিষয়
এই কাহিনিগুলো কেবল ধাঁধার উত্তর নয়—
এগুলো আমাদের চিন্তার দরজা খুলে দেয়।
মূল উদ্দেশ্য তিনটি—
১. দেখানো—
ইবনে আব্বাস (রা.)–এর জ্ঞান কেবল মুখস্থ বিদ্যা ছিল না; ছিল গভীর অনুধাবন ও আয়াতের অন্তর্নিহিত শক্তির উপলব্ধি।
২. শেখানো—
কুরআন শুধু ইবাদতের কিতাব নয়, চিন্তারও কিতাব।
যে আয়াত আমরা পড়ি, তার মধ্যে প্রশ্নের উত্তর, রহস্যের সমাধান ও দার্শনিক তত্ত্ব লুকিয়ে আছে।
৩. জাগানো—
একজন তরুণও হতে পারে জ্ঞানের সাগর, যদি তার অন্তরে থাকে খাঁটি নিয়ত ও আল্লাহর সাহায্য।
পাঠক এখান থেকে কী শিখবে?
🌿 চিন্তা করতে শিখবে।
কুরআনের আয়াত শুধু তিলাওয়াতের জন্য নয়, বোঝার জন্য।
🌿 আত্মবিশ্বাস পাবে।
বয়স নয়—জ্ঞানের গভীরতাই মানুষকে বড় করে।
🌿 আল্লাহর শক্তির প্রতি ঈমান দৃঢ় হবে।
তিনি চাইলে জাহান্নাম কথা বলে, লাঠি সাপ হয়, ভোর শ্বাস নেয়।
🌿 নম্রতা শিখবে।
জ্ঞান অহংকার নয়—এটি আমানত।
শেষ কথা—
ইবনে আব্বাস (রা.) আমাদের শেখান,
জ্ঞান মানে শুধু উত্তর জানা নয়—
বরং প্রশ্নের আড়ালে লুকানো হিকমত চিনে নেওয়া।
আমরা যদি কুরআনের সাথে সম্পর্ক গড়ি,
তবে আমাদের অন্ধকার মনেও একদিন ‘ভোরের শ্বাস’ ফুটে উঠবে।
আলেমদের আত্মত্যাগ সম্পর্কে আরও পড়ুন: ইবরাহিম তাইমী (রহ.) ও আলেমদের মর্যাদা
সাহায্যসুত্র পবিত্র কুরআন অনলাইন : Quran.com
